বেশির ভাগ দেশের ওপর ঘোষিত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ স্থগিত করলেও চীনের ক্ষেত্রে উল্টো পথে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিংয়ের ওপর পূর্ব ঘোষিত শুল্ক বহালই রাখেননি, এক-পঞ্চমাংশ বাড়িয়েছেনও। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতি বাণিজ্যে বিচ্ছেদের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় বিকল্প উপায়ের দিকে নজর রাখছেন চীনা রফতানিকারকরা। পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, চালান বাতিল এবং অন্য দেশের সঙ্গে লেনদেনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন তারা। খবর এফটি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বুধবার এক ঘোষণায় জানান, অধিকাংশ দেশের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শুল্ক ৯০ দিন স্থগিত থাকবে। তবে চীনের ওপর ১০৪ শতাংশ শুল্ক বজায় থাকবে এবং পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ায় আরো ২১ শতাংশ প্রযোজ্য হবে। যা পরে বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত।
চীনের অন্যতম বৃহৎ ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের মতে, দেশটির বিক্রেতারা মার্কিন বাজারে পণ্যের দাম ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেকে শুল্কের চাপে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
শেনজেন ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা সাধারণত অ্যামাজন, শেইন ও টেমুর মতো প্লাটফর্মের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা পর্যায়ে পণ্য বিক্রি করে। সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট ওয়াং জিন জানান, মার্কিন শুল্ককে অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি চীনা বিক্রেতারা সামাল দিতে পারবেন না।
টেমুতে পণ্য সরবরাহ করেন গুয়াংজুভিত্তিক এমন এক বিক্রেতা জানান, অনেক বিক্রেতা জর্ডানের মতো তৃতীয় দেশে কারখানা তৈরি করছে, যাতে সেখানে পণ্য তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করা যায়। আবার অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, এমন দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর পথ খুঁজছে।
তবে এ বিকল্পগুলো নিষ্কণ্টক নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প এমনও ইঙ্গিত দিয়েছেন, শুধু চীন নয়, অন্য দেশেও শুল্ক প্রসারিত করতে পারেন। যেসব চীনা কোম্পানি বিদেশে উৎপাদন স্থানান্তর করতে চাচ্ছে, বিষয়টি তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বর্তমানে বেশির ভাগ চীনা বিক্রেতা সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। ই-কমার্স ইনসাইট প্লাটফর্ম ব্র্যান্ডস ফ্যাক্টরির প্রধান নির্বাহী হু জিয়ানলং বলেন, ‘এখন দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা করা অত্যন্ত কঠিন।’
শিপিং কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, ট্রান্স-প্যাসিফিক ক্রয়াদেশ বাতিল হচ্ছে এবং আগামী সপ্তাহগুলোয় আরো বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা রয়েছে। সাংহাইভিত্তিক পরিবহন খাতের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রচুর পরিমাণে ক্রয়াদেশ বাতিল হতে দেখছি। এত বেশি অনিশ্চয়তা যে মানুষ কনটেইনারই ভাড়া নিতে চাইছেন না। আমাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে পাঠানোর জন্য প্রায় ১০০ কনটেইনারের নতুন ক্রয়াদেশ রয়েছে, কিন্তু সবই এখন স্থগিত।’
পুরোটা যে মার্কিন শুল্কের কারণে ঘটছে এমন নয়, বেইজিং পাল্টা শুল্ক আরোপ করায় অনেক ক্রয়াদেশ বাতিল হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য পণ্য রফতানি করে চীন। একটি সূত্র জানিয়েছে, চীনের ধার্য করা উচ্চ শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটি গ্যাস চালান বাতিল হয়েছে।
ট্রাম্পের ঘোষণার পরদিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ৮৪ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর করেছে চীনে। ফলে মার্কিন পণ্যের ওপর মোট শুল্ক শতভাগের বেশি হয়েছে। পরিস্থিতি বলছে, অন্য দেশগুলো নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করলেও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাণিজ্যযুদ্ধে পিছু হটবেন না। গতকাল চীনও মার্কিন আমদানির ওপর ১২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে।
শর্ত মেনে আলোচনার পথ খোলা আছে বলেও জানিয়েছে চীনা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তাদের বিবৃতি অনুসারে, এ বিষয়ে এখনো আলোচনার দরজা খোলা আছে। তবে তা সমান মর্যাদার ভিত্তিতে ও পারস্পরিক সম্মানজনক সংলাপের মাধ্যমে হতে হবে। প্রয়োজনে চীন শেষ পর্যন্ত লড়বে।
পাল্টাপাল্টি এ অবস্থানের প্রভাব পড়েছে চীনের মুদ্রা রেনমিনবির ওপর। মুদ্রাটি দুর্বল হয়ে বিনিময় হার ২০০৭ সালের পর সবচেয়ে নিচে নেমে গেছে। অর্থাৎ মুদ্রার অবমূল্যায়নও মেনে নিচ্ছে বেইজিং। গত বৃহস্পতিবার অনশোর রেনমিনবি বিনিময় হার ৭ দশমিক ৩৫১ ডলারে পৌঁছায়, যা প্রায় ১৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অবশ্য পরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক এ বিচ্ছেদের মধ্যে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। দেশটির কর্মকর্তারা সম্প্রতি ইউরোপিয়ান কমিশনের বাণিজ্য কমিশনার মারোস শেফচোভিচ এবং আসিয়ান বাণিজ্য জোটের চেয়ার ও মালয়েশিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী জাফরুল আজিজের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। চীনা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আসিয়ানসহ বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে চায় চীন। তারা বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাকে বজায় রাখতে ইচ্ছুক।
চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে প্রভাব ফেলেছে। আগের দিন বড় উল্লম্ফনের পর বৃহস্পতিবার মার্কিন শেয়ারবাজারে ধস নামে। বুধবার ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়লেও পরদিন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৫ দশমিক ২ শতাংশ পড়ে যায়। জাপানের টপিক্স ৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং তাইওয়ানের টাইক্স ৯ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে এদিন। স্টক্স ইউরোপ ৬০০ সূচক ৩ দশমিক ৭, জার্মানির ড্যাক্স ৪ দশমিক ৫ এবং যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ সূচক ৩ শতাংশ বাড়ে। তুলনামূলকভাবে চীনের শেয়ারবাজার শান্ত ছিল। বিশ্লেষকদের ধারণা, সরকার-সমর্থিত প্রতিষ্ঠানগুলো সিএসআই ৩০০ সূচক ১ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধির আংশিক কারণ। এছাড়া হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক বেড়েছে ২ দশমিক ১ শতাংশ।